মঙ্গলবার ১৩ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

একাত্তরের বীরত্বগাঁথা: রক্তঋণ ও আমাদের আগামী প্রজন্মের দায়বদ্ধতা

একাত্তরের বীরত্বগাঁথা: রক্তঋণ ও আমাদের আগামী প্রজন্মের দায়বদ্ধতা
ছবি : মুসকান টিভি | মোঃ আনোয়ার হোসাইন, অধ্যক্ষ এম.ডি.সি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ

ডিসেম্বর মাস। আমাদের অহংকারের মাস, বিজয়ের মাস। আবার একইসাথে এই মাস শোকেরও; কারণ এই বিজয়ের আনন্দাশ্রুর সাথে মিশে আছে স্বজন হারানোর বেদনা। ১৯৭১ সাল—বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই প্রিয় স্বাধীনতা। আজ এম.ডি.সি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ পরিবারের পক্ষ থেকে আমি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সেই সব অকুতোভয় বীর সেনানী ও শহীদদের, যাঁদের রক্তের অক্ষরে লেখা হয়েছে বাংলাদেশের নাম।

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসে আজ যখন আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। কী ছিল সেই জাদুকরী শক্তি, যা একটি নিরস্ত্র জাতিকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহস যুগিয়েছিল? সেই শক্তি ছিল দেশপ্রেম। সেই শক্তি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

একাত্তরের বীরত্বগাঁথা: রক্তঋণ ও আমাদের আগামী প্রজন্মের দায়বদ্ধতা

একাত্তরের রণাঙ্গন ও বীরদের আত্মত্যাগ
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন বাংলার দামাল ছেলেরা ঘরে বসে থাকেনি। কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি, ছাত্র, শিক্ষক, জনতা—সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গড়ে তুলেছিল এক দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ। তাঁদের কাছে আধুনিক অস্ত্র ছিল না, কিন্তু ছিল অসীম সাহস। মায়ের কোল ছেড়ে, স্ত্রী-সন্তানের মায়া ত্যাগ করে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন অনিশ্চিত এক যুদ্ধে। তাঁদের একটাই লক্ষ্য ছিল—হয় স্বাধীনতা, নয় মৃত্যু।

আমরা আজ স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, কিন্তু এই নিঃশ্বাসের ভারী বাতাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই সব বীর শহীদদের কথা, যাঁরা আর ফিরে আসেননি। রণাঙ্গনের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে তাঁদের রক্ত। কত তরুণ তাঁদের যৌবনকে বিসর্জন দিয়েছেন, কত পিতা তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন, কত মা তাঁর সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে পথের পানে চেয়ে ছিলেন—সেই হিসাব কি আমরা রাখি? মুক্তিযোদ্ধাদের এই ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারব না। তাঁরা আমাদের দিয়ে গেছেন একটি মানচিত্র, একটি পতাকা এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার অধিকার।

শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মেধার অপূরণীয় ক্ষতি
বিজয়ের ঠিক আগমুহূর্তে, ১৪ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা ছিল বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার এক ঘৃণ্য চক্রান্ত। শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী—যাঁরা ছিলেন জাতির বিবেক, তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই ক্ষতি আজও আমরা বহন করে চলেছি। এম.ডি.সি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ-এর একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আমি সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁদের দেখানো পথেই আমাদের হাঁটতে হবে। তাঁরা চেয়েছিলেন একটি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ। তাঁদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজ আমাদের কাঁধে।

স্বাধীনতার চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতা
স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন—এই ধ্রুব সত্যটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। মুক্তিযোদ্ধারা যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বপ্নের কতটুকু আমরা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? অর্থনৈতিক মুক্তি, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার ছিল, তা কি পূর্ণ হয়েছে? দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর নৈতিক অবক্ষয় কি আমাদের গ্রাস করছে না?

আজকের এই দিনে কেবল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোই যথেষ্ট নয়। শহীদদের আত্মার শান্তি তখনই হবে, যখন আমরা তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পারব। আর সেই বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হলো আমাদের আজকের ছাত্রসমাজ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নতুন প্রজন্মের ভূমিকা
এম.ডি.সি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ বিশ্বাস করে, পুঁথিগত বিদ্যার চেয়েও জরুরি হলো মনুষ্যত্ব ও দেশপ্রেমের শিক্ষা। আমাদের শিক্ষার্থীদের জানতে হবে তাদের শিকড়ের কথা। তাদের জানতে হবে, এই মাটি এমনি এমনি স্বাধীন হয়নি; এর প্রতিটি কণার জন্য কাউকে না কাউকে রক্ত দিতে হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের কাছে আমার আহ্বান—তোমরা হচ্ছো আগামীর বাংলাদেশ। তোমাদের হাতেই ন্যস্ত আছে এই দেশের ভবিষ্যৎ। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন ভৌগোলিক স্বাধীনতার জন্য। আর আজ তোমাদের যুদ্ধ করতে হবে দেশ গড়ার জন্য। তোমাদের যুদ্ধ হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে এবং সকল প্রকার অন্ধকারের বিরুদ্ধে। কলম হোক তোমাদের অস্ত্র, আর দেশপ্রেম হোক তোমাদের বর্ম।

আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সব সময় মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানোর চেষ্টা করি। কারণ, যে জাতি তার ইতিহাস জানে না, সে জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা কেবল জিপিএ-৫ প্রাপ্ত মেধাবী নয়, বরং তারা যেন হয় এক একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক মানুষ। যারা বিদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি, নিজের দেশকে সমৃদ্ধ করার স্বপ্নও দেখবে।

শিক্ষক ও অভিভাবকদের দায়বদ্ধতা
একজন অধ্যক্ষ হিসেবে আমি মনে করি, এই মহান দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, আমাদের শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও। আমাদের সন্তানদের মনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুনে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। তাদের শোনাতে হবে বীরত্বের গল্প, ত্যাগের গল্প। তাদের শেখাতে হবে, ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ অনেক বড়। যদি আমরা আমাদের সন্তানদের সৎ, সাহসী ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে না পারি, তবে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।

এম.ডি.সি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ পরিবার অঙ্গীকারবদ্ধ যে, আমরা এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলব যারা হবে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, কিন্তু হৃদয়ে ধারণ করবে ১৯৭১-এর চেতনা। যারা প্রযুক্তিতে হবে বিশ্বমানের, কিন্তু সংস্কৃতিতে হবে শতভাগ বাঙালি।

পরিশেষে, মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন একাত্তরের সকল শহীদ ও পরলোকগত মুক্তিযোদ্ধাদের জান্নাতুল ফেরদাউস নসিবে কবুল করেন। আর যাঁরা এখনও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই সশ্রদ্ধ সালাম ও দীর্ঘায়ু কামনা।

আসুন, বিজয়ের এই মাসে আমরা নতুন করে শপথ নিই—ভেদাভেদ ভুলে, সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করব। যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের পূর্বসূরিরা, সেই সোনার বাংলা আমরাই গড়ব। আমাদের কর্মে, চিন্তায় ও মননে বেঁচে থাকুক একাত্তরের সেই অবিনাশী চেতনা।

বিশ্ব মানচিত্রে সগৌরবে উড়ুক আমাদের লাল-সবুজের পতাকা।

লেখক পরিচিতি:
মোঃ আনোয়ার হোসাইন
অধ্যক্ষ
এম.ডি.সি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ

মন্তব্য করুন:

channel muskan ads