গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানাধীন টিএনটি বাজার জামে মসজিদের খতিব আলহাজ ক্বারি মুফতি মহিবুল্লাহ মিয়াজীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে একটি ‘সাজানো নাটক’ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ট্র্যাকিং ডেটা এবং চিকিৎসকের প্রতিবেদন—সবকিছুতেই মহিবুল্লাহর বক্তব্যের সঙ্গে গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। পুলিশ এখন এই খতিবের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) টঙ্গী থানা সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর আগে, গতকাল সোমবার (২৭ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে মাওলানা মুহিব্বুল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য টঙ্গী পূর্ব থানায় আনা হয়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্রিফিং দেওয়া হয়নি, তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে যে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ নিজেই স্বীকার করেছেন ঘটনাটি তার স্বেচ্ছায় সাজানো। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) হেডকোয়ার্টারে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) সকাল পৌনে ৭টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থানাধীন হেলিপ্যাড বাজার এলাকায় শিকল বাঁধা অবস্থায় মহিবুল্লাহকে দেখতে পান স্থানীয়রা। তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে তেঁতুলিয়া থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে, মহিবুল্লাহর দাবি অনুযায়ী অপহরণের স্থান শিলমুন সিএনজির সামনের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে তাকে দ্রুত হেঁটে যেতে দেখা যায়। সেখানে কোনো ব্যক্তি বা অ্যাম্বুলেন্সের উপস্থিতি ছিল না। মোবাইল ট্র্যাকিং ও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, তিনি ক্যামেরার আড়ালে চলে যান এবং পরে সিরাজগঞ্জ হয়ে পঞ্চগড়ে পৌঁছান।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, মহিবুল্লাহর শরীরে কোনো দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন ছিল না; শুধু ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, খতিব নিজেই নিজের পায়ে শিকল বেঁধেছিলেন এবং পুরো ঘটনাটি ছিল তার নিজের সাজানো নাটক।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, খতিবের উল্লিখিত হুমকির চিঠি সম্পর্কেও অনুসন্ধান চলছে এবং এই ঘটনার পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, আলজাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামি এই নিখোঁজ ঘটনা সম্পর্কে নতুন তথ্য দিয়েছেন। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে নেওয়া চারটি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে মুহিব্বুল্লাহ পাম্পের সামনে দিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছেন। ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স পথরোধ করে তাকে অপহরণের যে দাবি করা হয়েছিল, সিসিটিভি ফুটেজে এমন কোনো ঘটনা দেখা যায়নি; বরং তাকে একাই দ্রুত গতিতে হেঁটে যেতে দেখা গেছে।
তিনি আরও বলেন, সামনের সেতুর ওপরে পুলিশের স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও মুহিব্বুল্লাহকে একাই হাঁটতে দেখা যায়। অথচ এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, ফিলিং স্টেশনের সামনে তাকে অপহরণ করা হয়।
জুলকারনাইন সায়ের পরিশেষে জানান, সকাল ৬টা ৫৪ মিনিটে এলাকা থেকে রওনা হয়ে মুহিব্বুল্লাহ প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ফিলিং স্টেশনে পৌঁছান সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে। ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. সোলেইমান নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের জানিয়েছেন, “তিন দফায় পুলিশের বিভিন্ন শাখা আমাদের সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ করেছে। আমাদের ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে হুজুরকে অপহরণ করা হয়নি।”





