Facebook
Twitter
WhatsApp

ফেসবুক প্রেম প্রতারণা, যেভাবে হাতিয়ে নেয়া হয় ৩ কোটি টাকা

image_pdfimage_print

৬০ সেকেন্ডে ফেসবুক আইডি ক্রিয়েট। আইডিতে জুড়ে দেয়া হয় মিষ্টি একটি নাম। উল্লেখ থাকে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বিষয়টিও। প্রোফাইলে থাকে নারীর আবেদনময়ী ছবি। ওয়ালে ঝুলে নানান ভঙ্গির আকর্ষণীয় ছবি। তাতে লাইক-কমেন্টের ছড়াছড়ি। দামি পোশাক, গয়না, অভিজাত মার্কেট ও গাড়িতে তোলা ছবিতে বুঝানো হয় পারিবারিক স্ট্যাটাস। সাজানো গুছানো এরকম আইডি থেকে বন্ধু হওয়ার আমন্ত্রণ পান উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী, প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তিরা। বন্ধু হওয়ার পর আবেদনময়ী নারীর খুব বেশি সময় লাগে না সখ্য গড়ে তুলতে। অল্প দিনেই সম্পর্ক গভীর থেকে আরও গভীর হয়।

শুরু হয় প্রেমের সম্পর্ক। চ্যাটিং ও অডিও কলে স্বাভাবিক কথাবার্তা থেকে একান্ত ব্যক্তিগত কথা। চাহিদামতো আপত্তিকর ভিডিও পাঠান প্রেমিকা। আপত্তিকরভাবে আসেন ভিডিও কলে। তাতেই আসক্ত হয়ে যান প্রেমিক। গভীর প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে প্রেমিক নিজেই বিয়ের প্রস্তাব দেন। সময় নেন না প্রেমিকাও। আশ্বাস দেন দ্রুতই তাদের বিয়ে হবে। তারপর শুরু হয় বিভিন্ন অজুহাতে প্রেমিকার আবদার। কতো প্রকারের বাহানা-আবদার করেন তার শেষ নাই। ধনী পিতা-মাতা হাসপাতালে ভর্তি, কোটিপতি ছেলের সঙ্গে ছোট বোনের বিয়ে, মেধাবী ভাই আমেরিকা পড়তে যাবে, মফস্বল শহরে বহুতল বাড়ির কাজ আটকে আছে, বাজারে নতুন আইফোন এসেছে।

 

এরকম নানা অজুহাতে টাকা ধার। প্রেমিকা যখন একসময় বুঝতে পারেন টাকার খনি প্রেমিকের কাছ থেকে আর আদায় করা সম্ভব না তখনই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ সবকিছু থেকে তাকে ব্লক করে দিয়ে গাঢাকা দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে কথিত এক দম্পতি এভাবেই মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। নিজেদের দম্পতি পরিচয় দিলেও বাস্তবে তারা নিজেরাই প্রেমিক-প্রেমিকা। ফেসবুকের মাধ্যমেই তাদের পরিচয় ও প্রেম। পরে তারাই গত ৫ বছর ধরে মানুষকে অসম প্রেমের ফাঁদে ফেলে অন্তত তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তবে মনজুর মোরশেদ নামের ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির ৮০ লাখ টাকা আত্মসাৎ তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। থানা পুলিশ হয়ে অভিযোগ যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ইউনিটের কাছে। পরে সাইবার টিম ওই দুই প্রতারককে গ্রেপ্তার করে।

 

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- সুজন তালুকদার ওরফে শাওন ওরফে তানভীর হাসান ওরফে জাহিদ হাসান ওরফে লুৎফর রহমান (২৫) ও পুষ্পা আক্তার ওরফে আবিরা জাহান কলি (২৩)। তেজগাঁও থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় টাঙ্গাইল জেলার ভূয়াপুর ও সদর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তানভীর একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। আর কলি টাঙ্গাইলের কুমুদিনী কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ২টি মোবাইল ফোন, ৫টি সিম কার্ড ও ২০টি ফেসবুক আইডি উদ্ধার করা হয়েছে। ডিবি সাইবারের ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের কর্মকর্তারা বলেছেন, মামলার বাদী মনজুর মোরশেদের সঙ্গে ২০১৮ সালের ১৫ই জুন ফেসবুকের মাধ্যমে আবিরা জাহান কলি নামের এক নারীর পরিচয় হয়। পরিচয়ের পরেই তাদের নিয়মিত কথা হতো। একসময় তাদের মধ্যে অসম প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা বিয়ে করারও সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৯ সালের ৩রা জুলাই কলি তার কাছে মৃত মায়ের মিলাদের কথা বলে ১ লাখ টাকা ধার চায়। এক মাসের ভেতরে সেই টাকা ফেরত দেয়ারও আশ্বাস দেয়। মোরশেদ তখন সরল বিশ্বাসে তিনটি বিকাশ নম্বরে ৯১ হাজার ৮০০ টাকা পাঠায়। এক মাস পরে সেই টাকা ফেরত চাইলে কলি জানায়, এখনই দিতে পারবে না।

তবে টাঙ্গাইল সদরে থাকা তাদের পতিত জমিতে নতুন বাড়ি নির্মাণ করার জন্য একটি ডেভেলপার কোম্পানিকে দেয়া হবে। সেখান থেকে পাওয়ার পর পাওনা টাকা ফেরত দিবে। এর কিছুদিন পর কলি মোরশেদকে জানায়, ডেভেলপারকে দেয়া জমিতে তার ফুফুদের কিছু অংশ আছে। তাই সেটি কিনে নিতে হবে। তবেই ডেভেলপাররা কাজ শুরু করবে। ডিবি জানায়, এভাবে চলে যায় আরও মাসখানেক। এরইমধ্যে কলি আবার মোরশেদকে ফোন করে জানায়- তার বড় ভাই তানভীর হাসান কথা বলবে। তখন তানভীর ফোনে মোরশেদকে ফুফুর অংশ কিনে নেয়ার জন্য ১০ লাখ টাকা ধার দেয়ার কথা বলে। মোরশেদ সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য ডেভেলপার কোম্পানির মোবাইল নম্বর চায়। কলি একটি মোবাইল নম্বর তাকে দেয়। ওই নম্বরে জাহিদ হাসান নামের এক ব্যক্তি মোরশেদকে বলে জমির কাছে রাস্তার সমস্যা এবং কাগজে কিছু সমস্যা আছে। সেগুলো ক্লিয়ার হলে কাজ শুরু করবে। তার কথা বিশ্বাস করে তিন মাসের মধ্যে কলির দেয়া বিভিন্ন বিকাশ নম্বরে মোরশেদ ১০ লাখ টাকা পাঠায়।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন, এখানেই থেমে যায়নি কলির প্রতারণা। কিছুদিন পর লুৎফর রহমান বারেক নামের এক ব্যক্তি কলির বাবার পরিচয়ে মোরশেদকে ফোন দিয়ে জানায় জমির খতিয়ান ও নাম জারির জন্য ১ লাখ ১০ হাজার টাকা প্রয়োজন। হবু শ্বশুরের আবদার তাই সেই টাকাও মোরশেদ কলির কাছে পাঠায়। এরইমধ্যে শুরু হয় বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি। মহামারির মধ্যেই কলির দাবির প্রেক্ষিতে তাদের দোতলা বাড়ির তৃতীয় তলা কমপ্লিট করার জন্য বিভিন্ন সময় বিকাশ, নগদ ও এসএ পরিবহনের মাধ্যমে আরও ৩৬ লাখ টাকা পাঠায় মোরশেদ। এমন পরিস্থিতিতে মোরশেদও কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায়। কলির বাবা নামধারী লুৎফর রহমান মোরশেদকে বলে কলির সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে নতুন বাড়িটি তার নামে রেজিস্ট্রি করে দিবে। এতে কিছু আশার বাণী পায় মোরশেদ। আরও কিছুদিন যাওয়ার পর কলি তার ছোট বোনের বিয়ের জন্য আরও ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা মোরশেদের কাছ থেকে নিয়ে যায়। এভাবে বিভিন্ন সময় কলি প্রায় ৮০ লাখ টাকা মোরশেদের কাছ থেকে নিয়ে যায়।

কিন্তু এত টাকা নেয়ার পরও তার চাহিদা মিটেনি। সাম্প্রতিক সময়ে আরও ৫ লাখ টাকা চেয়ে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিচ্ছে। পরে অবশ্য মোরশেদের বুঝতে আর বাকি থাকেনি তাকে ধোঁকা দিয়েছে কলি। এবং এও বুঝতে পারেন কলি প্রকৃতপক্ষে প্রতারক। তার আরও সহযোগী রয়েছে। উপায়ান্তর না পেয়ে মোরশেদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে থানায় মামলা করেন। ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ বলেন, প্রতারণার জন্য তারা আগে থেকে টার্গেট ফিক্সড করতো। টার্গেট ব্যক্তি যদি নারী হয় তবে সেক্ষেত্রে তানভীর ও পুরুষ হলে কলি তাদের সঙ্গে কথা বলে। কলি টার্গেটদের মন জয় করার জন্য আবেদনময়ী ছবি ও একান্ত ভিডিও পাঠিয়ে দিতো। ডিসি বলেন, বহু মানুষ তাদের প্রতারণায় শিকার হয়েছেন। একটাই উদ্দেশ্য ছিল টাকা হাতিয়ে নেয়া। এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকার হিসাব পেয়েছি। তাই ফেসবুকে অপরিচিত কারও ফেসবুক ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট গ্রহণ করা যাবে না। ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও কাউকে পাঠানো যাবে না।

খবরটি শেয়ার করুন

Table of Contents

প্রধান উপদেষ্ঠা : আলহাজ্ব ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ এমপি, সংসদ-সদস্য ঢাকা ১৬,প্রকাশক : মোঃ মাসুদ রানা (জিয়া) ।সম্পাদক : শাহাজাদা শামস ইবনে শফিক।সহকারী সম্পাদক : সৌরভ হাসান সোহাগ খাঁন। 

Subscribe Now

নিউজরুম চিফ এডিটর : মোঃ শরিফুল ইসলাম রবিন।সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ মতিঝিল বা/এ, ৪থ তলা, সুইট-৪০২, ঢাকা- ১০০০বার্তা কক্ষ : ০১৬৪২০৭৮১৬৪ – বিজ্ঞাপনের জন্য : ০১৬৮৬৫৭১৩৩৭

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by www.channelmuskan.tv © 2022

x