ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। যেকোনো বড় ভূমিকম্পের সময় বা পরে বড়দের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যেও চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই আতঙ্ক থেকে শিশুরা অনেক সময় ‘প্যানিক অ্যাটাক’-এর শিকার হতে পারে।
প্যানিক অ্যাটাক কী?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, প্রচণ্ড ভয়ের কারণে শরীরে ও মনে যে আকস্মিক ও অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তাকেই প্যানিক অ্যাটাক বলা হয়। এর ফলে শিশুর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই ভয় বা ট্রমা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং শিশু স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ভয় পায়, তবে অবশ্যই একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
ভূমিকম্পের সময় বা অব্যবহিত পরে শিশু যদি প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়, তবে তাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করতে অভিভাবকদের নিচের ৫টি পদক্ষেপ অনুসরণ করা জরুরি:
১. নিজেকে শান্ত রাখা ও অভয় দেওয়া
শিশুর আতঙ্ক কাটাতে হলে সবার আগে অভিভাবককে শান্ত থাকতে হবে। নিজের ভীতি শিশুর সামনে প্রকাশ করা যাবে না। শিশুর সঙ্গে অত্যন্ত মৃদু ও মমতা মাখা স্বরে কথা বলুন। তাকে বোঝান যে, সে একা নয় এবং আপনারা তার সুরক্ষায় সবসময় পাশে আছেন। আপনার ধীরস্থির আচরণ শিশুর উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করবে।
২. মনোযোগ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা
ভয়াবহ পরিস্থিতির দৃশ্য বা আলোচনা থেকে শিশুর মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। তাকে তার প্রিয় খেলনা দেওয়া, গল্পের বই পড়ে শোনানো বা এমন কোনো কাজে ব্যস্ত রাখা যেতে পারে, যা তাকে আনন্দ দেয়। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল যা শিশুর মস্তিষ্ককে ভয়ের উৎস থেকে দূরে রাখে।
৩. পর্যাপ্ত পানি বা তরল পান করানো
আতঙ্কিত অবস্থায় শরীর দ্রুত নিস্তেজ হয়ে পড়তে পারে। তাই শিশুকে শারীরিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে দিতে অল্প অল্প করে পানি বা ফলের রস পান করতে দিন। এটি তার অস্থিরতা কমাতে সহায়ক। তবে মনে রাখবেন, শিশু পান করতে না চাইলে তাকে জোর করবেন না।
৪. শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা ‘ব্রিদিং এক্সারসাইজ’
শিশুর স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে তাকে ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিতে এবং ছাড়তে উৎসাহিত করুন। প্রয়োজনে আপনি নিজে তার সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামটি করুন যাতে সে আপনাকে অনুসরণ করতে পারে। এ সময় শিশুর চোখের দিকে তাকান এবং তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখুন। সে যদি কথা বলতে না পারে, তবে জোর করে কথা বলানোর চেষ্টা করবেন না।
৫. স্পর্শের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (হাগ থেরাপি)
শিশুকে আশ্বস্ত করার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরা বা আলিঙ্গন করা। অভিভাবকের উষ্ণ স্পর্শ শিশুকে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। তাকে বারবার বলুন যে সে এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ।
সতর্কতা:
যদি দেখেন শিশুটি এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কোনো কথা বলছে না, তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই বা সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে—তবে বুঝতে হবে সে গভীর মানসিক আঘাত বা ‘শক’-এ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তাকে নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সঠিক সময়ে সহায়তা পেলে এই ট্রমা থেকে শিশুকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা সম্ভব।





