শনিবার ৬ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

রংপুরের ব্যবসায়ী আশরাফুলের দেহ ২৬ খণ্ড: বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

রংপুরের ব্যবসায়ী আশরাফুলের দেহ ২৬ খণ্ড: বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবি: সংগৃহীত

রংপুরের ব্যবসায়ী আশরাফুল হক হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ২৬ টুকরো করার আগে ব্যাপক পরিমাণে ইয়াবা সেবন করে হত্যাকারী জরেজ। ইয়াবার প্রভাবে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সে হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে আশরাফুলকে হত্যা করে। এরপর জরেজ ও তার প্রেমিকা শামীমা আক্তার কোহিনুর নিহত আশরাফুলের লাশ পাশের ঘরে রেখেই অন্য ঘরে রাত কাটায় এবং শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি জরেজুল ইসলামের প্রেমিকা শামীমা আক্তার কোহিনুরকে (৩৩) বিভিন্ন আলামতসহ গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৩।

শনিবার (১৫ নভেম্বর) কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। গ্রেপ্তারকৃত শামীমার প্রাথমিক স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে তিনি এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন।

র‍্যাব জানায়, গত ১৪ নভেম্বর সকালে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার বড় বিজরা এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে শামীমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, ব্ল্যাকমেইলিং এবং লাশ গুমের পুরো প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল।

লে. কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ১১ নভেম্বর রাতে ব্যবসায়ী আশরাফুল হক তার বন্ধু জরেজুল ইসলামের সঙ্গে ব্যবসায়িক পাওনা আদায়ের জন্য রংপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ১২ নভেম্বর সকাল থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ায় পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট এলাকার পানির পাম্প সংলগ্ন দুটি নীল রঙের ড্রাম থেকে ২৬ টুকরো করা একটি অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। পরবর্তীতে আঙুলের ছাপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, মরদেহটি নিখোঁজ আশরাফুল হকের।

গ্রেপ্তারকৃত শামীমা আক্তারের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে র‍্যাব জানতে পারে, শামীমা ও জরেজ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন। জরেজ শামীমাকে জানায় যে, তার এক বন্ধুকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে ১০ লাখ টাকা আদায় করা সম্ভব। এই টাকার মধ্যে জরেজ ৭ লাখ এবং শামীমা ৩ লাখ টাকা পাবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার এক মাস আগে থেকেই শামীমা নিহত আশরাফুলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তাকে আকৃষ্ট করে। নিয়মিত অডিও-ভিডিও কলে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।

লে. কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন আরও বলেন, ১১ নভেম্বর রাতে ঢাকায় আসার পর জরেজ, আশরাফুল এবং শামীমা ঢাকার শনির আখড়ার নূরপুর এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেয়। সেখানে ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে আশরাফুলকে মালটার শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। আশরাফুল অচেতন হয়ে পড়লে জরেজ বাইরে থেকে শামীমা ও আশরাফুলের অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করে।

শামীমার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর দুপুরে আশরাফুল পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়লে জরেজ তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং মুখে কসটেপ লাগায়। এরপর ইয়াবা সেবনের উত্তেজনায় জরেজ হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে আশরাফুলকে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের পর লাশ পাশের ঘরেই রেখে জরেজ ও শামীমা অন্য ঘরে রাত কাটায় এবং শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়।

র‍্যাব-৩ এর অধিনায়ক জানান, পরদিন সকালে জরেজ বাজার থেকে চাপাতি ও দুটি ড্রাম কিনে আনে এবং লাশ ২৬ টুকরো করে ড্রামে ভরে। দুপুরে একটি সিএনজি ভাড়া করে ড্রামগুলো বাসা থেকে বের করা হয়; পরে মাঝপথে সিএনজি পরিবর্তন করে হাইকোর্টের মাজার গেটের কাছে পৌঁছায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখে তারা ড্রাম দুটি সড়কের পাশের গাছতলায় ফেলে দ্রুত অটোযোগে সায়েদাবাদে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে জরেজ শামীমাকে কুমিল্লার নিজ বাড়িতে চলে যেতে বলে। এরপর থেকে তাদের দুজনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শামীমার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শনির আখড়ার নূরপুর এলাকা থেকে আশরাফুলের রক্তমাখা পাঞ্জাবি-পায়জামা, হত্যায় ব্যবহৃত দড়ি, কসটেপ, একটি গেঞ্জি ও হাফপ্যান্ট উদ্ধার করেছে র‍্যাব-৩।

র‍্যাব জানিয়েছে, তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করা। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতার বিষয় আছে কি না, তা প্রধান আসামি জরেজকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পরিষ্কার হবে।

গ্রেপ্তারকৃত শামীমা আক্তারকে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হবে।

মন্তব্য করুন:

channel muskan ads