রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হয়েছেন তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাইফ মামুন। সোমবার (১০ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফটকের সামনে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মুখে মাস্ক পরা দুই ব্যক্তি পিস্তল বের করে মামুনকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে দ্রুত মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
আহত অবস্থায় মামুনকে প্রথমে ন্যাশনাল মেডিক্যালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিশেষত ‘ইমন-মামুন বাহিনী’ বনাম ‘জোসেফ গ্রুপের’ সংঘর্ষ এবং টার্গেট কিলিংয়ের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মামুন হত্যাকাণ্ড ও পুরোনো শত্রুতা
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকালে মামুন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এ একটি মামলায় হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুরের পিসি কালচার হাউজিং এলাকায় জাহিদ আমিন ওরফে হিমেল হত্যাকাণ্ডের মামলায় তিনি অভিযুক্ত ছিলেন। এই মামলায় তার সঙ্গে আরও পাঁচজন আসামি রয়েছেন—ওসমান, মাসুদ ওরফে নাজমুল হোসেন, রতন, ইমন ও হেলাল। সেদিন সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য থাকলেও কোনো সাক্ষী হাজির না হওয়ায় শুনানি আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
আদালত থেকে বেরিয়ে মামুন ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে হাসপাতালের ফটক পার হওয়ার পর হঠাৎ দৌড়ে আবার ভেতরে ফিরে আসেন তিনি। তখনই গুলির শব্দে আশপাশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন।
হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী মো. তারেক জানান, “দুই জন দুর্বৃত্ত হঠাৎ এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। একটি গুলি জানালার কাচে লাগে, কয়েকটি গুলি মামুনের শরীরে লাগে। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে আমাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঢাকা মেডিক্যালে পাঠানো হয়।”
মামুনের শরীরে পাঁচটি গুলির চিহ্ন
নিহত তারিক সাইফ মামুনের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইদুল হোসেন মিলন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মৃতদেহে মোট পাঁচটি গুলিবিদ্ধ জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মাথার নিচে একটি, বাম পিঠে একটি, বুকের ডান পাশে একটি, বাম হাতের কব্জিতে একটি এবং ডান হাতের কব্জির ওপরে একটি গুলি লেগেছে তার।
জোসেফের টার্গেট ছিলেন মামুন!
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই হত্যাকাণ্ড আকস্মিক নয়, বরং এটি আন্ডারওয়ার্ল্ডের দীর্ঘদিনের প্রতিশোধ-রাজনীতির ধারাবাহিকতা। সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যাকাণ্ড এবং ঢাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তোফায়েল আহমেদ জোসেফের সঙ্গে সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও তারিক সাইফ মামুনের বিরোধ শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে।
ইমন ও মামুন একসময় ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ইমন-মামুন বাহিনী’ ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। তারা দুজনেই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই টিপু হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। কারাগারে দীর্ঘদিন একই সেলে ছিলেন মামুন ও ইমন।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তেজগাঁও এলাকায় মামুনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল একদল সন্ত্রাসী। সে সময় মোটরসাইকেল আরোহী ভুবন চন্দ্র শীলের মাথায় গুলি লেগেছিল এবং পরে তিনি মারা যান। ঘটনার পর পুলিশ জানিয়েছিল, সেই হামলার পেছনে কারাবন্দি ইমনের অনুসারীরা ছিল। সূত্রমতে, বর্তমানে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অবস্থান করছেন ইমন।
তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি সূত্রের দাবি, মামুন হত্যার মূলে রয়েছে আজিজ আহমেদের ভাই জোসেফ। সূত্রটি আরও দাবি করে যে, সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যার পর থেকেই জোসেফের টার্গেটে ছিলেন মামুন।
‘ইব্রাহিম গ্রুপ’ ছিল মাঠে?
সূত্র বলছে, মামুন কিলিং মিশনে মূল ভূমিকা রেখেছে ‘ইব্রাহিম গ্রুপ’। এই গ্রুপে ইব্রাহিম, সানি, অনিক, পারভেজ, মাসুদ, নাজমুল, ভাইগ্না রনি ও কিলার কামাল অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইব্রাহিম বাহিনীর সদস্যরা ৫ আগস্টের পর থেকে ইমন গ্রুপের হয়ে কলাবাগান, ধানমন্ডি, রায়েরবাজার, জিগাতলা, মনেশ্বর রোড ও ট্যানারি পট্টি এলাকায় শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে আসছে। ফ্ল্যাট, জমি, আড়ত থেকে শুরু করে বাজার-দোকান—সবখানেই তাদের আধিপত্য রয়েছে। তাদের ভয়ে ভুক্তভোগীরা মামলা করার সাহস পান না।
বিদেশে বসে জোসেফের কলকাঠি নাড়া?
সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ আহমেদের ভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফ নব্বইয়ের দশকে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে পরিচিতি পান। ১৯৯৭ সালে তাদের আরেক ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর গুলিতে খুন হন।
২০০৪ সালে ফ্রিডম পার্টির নেতা মোস্তফা হত্যা মামলায় জোসেফকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখলেও ২০১৫ সালে আপিল বিভাগ তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন। জোসেফের বিরুদ্ধে একসময় চাঁদাবাজি, খুন ও অবৈধ অস্ত্র বহনসহ অন্তত ১১টি মামলা ছিল। ২০১৮ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পেয়ে দেশ ছাড়েন জোসেফ। বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে জানা গেছে, জোসেফ মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।
পুলিশের বক্তব্য: ‘তদন্ত চলছে, সব দিক দেখা হচ্ছে’
ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুই ব্যক্তি সরাসরি মামুনকে গুলি করেছে। তাদের পরিচয় যাচাই চলছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা, কী কারণে, কার নির্দেশে—এসব বিষয় আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ কিংবা ব্যবসায়িক বিরোধ; সব দিকই আমরা বিবেচনায় নিচ্ছি। কোনো তথ্য চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়ার আগে কিছু বলা ঠিক হবে না।”
ফিরছে পুরোনো আতঙ্ক?
চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় আটক হয়ে ২০ বছর জেলে থাকার পর ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পান তারিক সাইফ মামুন। জামিনের তিন মাস পরই তেজগাঁওয়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও এবার তিনি খুন হলেন আদালত থেকে বেরিয়ে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে। মামুন হত্যাকাণ্ডের পর আবারও রাজধানী ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে পুরোনো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন





