বরিশাল: দীর্ঘ ২৩ বছর পর অবশেষে দেশে ফিরছেন নব্বইয়ের দশকের আলোচিত ছাত্রনেতা ও বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভি। ২০০২ সাল থেকে কানাডায় অবস্থানরত এই সাবেক ছাত্রদল নেতার প্রত্যাবর্তনের খবরে বরিশাল-২ আসনে নতুন করে রাজনৈতিক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ১৯৯৬ সালে এই আসন থেকেই তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অভির দেশে ফেরার বিষয়টি তিনি নিজেই গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। আলোচিত মডেল সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নি হত্যাসহ একাধিক রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় অভি দীর্ঘ ২৩ বছর দেশের বাইরে ছিলেন। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি তিন্নি হত্যা মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পরই তাঁর দেশে ফেরার গুঞ্জন জোরালো হয়। এমনকি, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথাও শোনা যাচ্ছে।
বরিশালের উজিরপুরের সন্তান গোলাম ফারুক অভি একসময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৬ সালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী হিসেবে তিনি বরিশাল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের বর্তমান উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেন আলালকে পরাজিত করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে বরিশাল-২ আসনটি উজিরপুর-বাবুগঞ্জ নিয়ে গঠিত হলেও, পরবর্তীতে বাবুগঞ্জ মুলাদীর সাথে যুক্ত হয়ে বরিশাল-৩ এবং উজিরপুরের সাথে বানারীপাড়া যুক্ত হয়ে বরিশাল-২ নির্বাচনী এলাকা পুনর্গঠিত হয়। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর, ২০০২ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি দেশ ছাড়েন।
গোলাম ফারুক অভির স্বজন উজিরপুরের ধামুরা এলাকার বাসিন্দা পনির হাওলাদার নিশ্চিত করেছেন যে অভি দেশে ফিরছেন এবং লোকমুখে তাঁর নির্বাচনের কথা শোনা যাচ্ছে, যদিও অভি নিজে তাদের কাছে বিষয়টি জানাননি।
উজিরপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম সরদার মনে করেন, অভি একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরিশাল-২ আসনের নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেবে। তিনি বলেন, “ব্যক্তি হিসেবে গোলাম ফারুক অভির যে জনপ্রিয়তা রয়েছে, তা অনেকেরই নেই। এ ক্ষেত্রে দলীয়ভাবে না হোক স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করলেও তার সঙ্গে অনেক প্রার্থী ভোটের মাঠে টিকবে না।”
তবে, উজিরপুরের বাসিন্দা ও বরিশাল দক্ষিণ জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান সুমন ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “গত ১৭ বছর বিএনপি নেতাকর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন, আর অভি ভাই বিদেশে রাজকীয় জীবন কাটিয়েছেন। এখন তার ফেরা না ফেরায় কিছু আসে যায় না। ফ্যাসিস্টের আমলে যিনি জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, বিএনপি তাকেই মনোনীত করবে।” তিনি অভির স্বতন্ত্র নির্বাচনের বড় কোনো প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন না।
ইতিমধ্যে বরিশাল-২ আসনে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়া বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় আছেন সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু, কাজী দুলাল হোসেন, কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু এবং সাইফ মাহমুদ জুয়েল, যারা বিগত সরকারের আমলে ব্যাপক নির্যাতন ও মামলার শিকার হয়েছেন।
বিএনপির সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু অভির দেশে ফেরায় খুশি। তবে তিনি প্রত্যাশা করেন যে অভির চলাচল অতীতের মতো না হয়ে মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকবে। তিনি আরও বলেন, “একানব্বই, ছিয়ানব্বই বা এরশাদের সময় যে নির্বাচন ছিল, সেই মার্কা নির্বাচন চলবে না। জনগণের ভোটে যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনিই পার্লামেন্টের নির্বাচিত নেতা হবেন। অভি ভাই দেশের ছেলে, আসবেন। তিনি আসায় দলে বা দেশে কোনো প্রভাব পড়বে না। তার মতো হাজারো নেতা এ দেশে আছেন।”
জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী এবং দলের বরিশাল জেলার সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল মান্নান বলেন, “যেই নির্বাচন করুক না কেন, আমাদের নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ আমরা অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং সুশৃঙ্খল একটি দল। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী যেই হোক না কেন, সেটা আমাদের দেখার বিষয় না।”





