কৃচ্ছ সাধন করছে সরকার, ঋণ গ্রহণে

করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঋণ গ্রহণে কৃচ্ছ সাধন করছে সরকার। অর্থবছরের (২০২০-২১) তিন মাসে ঋণ নেয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল তার চেয়ে কম নিয়েছে।

গত জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত থেকে ঋণ নেয়ার কথা ছিল ৪৬ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা।

কিন্তু এই সময় ঋণ নেয়া হয়েছে ৩১ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা।এই ঋণের হার বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায়ও কম। গত অর্থবছরে একই সময়ে সরকার ধার করেছিল ৩৭ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক থেকে কম ঋণ নেয়া এই মুহূর্তের জন্য ভালো।

বিদেশি উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ সর্বোচ্চ ভালো পথ। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্তও ঠিক আছে। তিনি আরও বলেন, গত বছর বৈদেশিক উৎস থেকে ভালো ঋণ পাওয়া গেছে। নতুন বছরে সে ধারা ঠিক থাকবে কি না সেটি নিশ্চিত নয়। তবে বিদেশি উৎস থেকে বেশি মাত্রা ঋণ নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কোনোভাবে এখন সরকারকে ব্যয় সাশ্রয় করলে হবে না।

এতে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। প্রতি বছর সরকারের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি থাকে। এ জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস (ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র খাত) এবং বৈদেশিক খাত থেকে ঋণ করতে হয়। এই ঋণ নেয়ার একটি লক্ষ্যমাত্রা অর্থবছরের শুরুতে ঠিক করে নেয় সরকার। যার ঘোষণা বাজেটে থাকে।

এ বছর করোনাভাইরাস মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকারের অস্বাভাবিক ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা সরঞ্জাম, টিকা কেনা, চিকিৎসকের প্রণোদনা, সরকারি চাকরিজীবীদের মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা, সামাজিক নিরাপত্তা ও খাদ্য দুর্যোগখাতে ব্যয় বেড়েছে।

এসব ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে সরকার ঋণ নিচ্ছে অতি সতর্কতার সঙ্গে। পাশাপাশি ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে কৌশল পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ বছর সরকার ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বেশি জোর দিচ্ছে সঞ্চয়পত্র খাত ও বৈদেশিক উৎসকে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ কম নেয়ার কৌশলে হাঁটছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত জুলাই-সেপ্টেম্বরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নেয়া হয়েছে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে। ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। এই সময়ে ঋণ নেয়ার কথা ছিল সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। গেল তিন মাসে মোট ঋণের ৪৩ দশমিক ৮০ শতাংশ এ খাত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। অথচ গত বছর এই সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ ছিল মাত্র ৫ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, করোনার কারণে মানুষ সঞ্চয়মুখী হচ্ছে। কারণ ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়ে দেয়া এখন সঞ্চয়পত্র বেশি ক্রয় করছে। সাধারণ মানুষকে সুবিধা দিতে এ খাত থেকে বেশি হারে ঋণ নিচ্ছে সরকার।

করোনার কারণে বিভিন্ন দাতা সংস্থা ঋণ দিচ্ছে বেশি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও বেশ সাড়া পাচ্ছে। তথ্য মতে, সরকার এ বছর ধার করার জন্য বৈদেশিক উৎসকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। নিয়মিত দাতা সংস্থা ছাড়াও নতুন উৎস খুঁজে বের করা হচ্ছে ঋণ সহায়তার জন্য। গেল তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বৈদেশিক উৎস থেকে ধার করা হয়েছে ৮ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা।

এই সময়ে বৈদেশিক খাত থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার ১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বৈদেশিক খাত থেকে কম ঋণ নেয়া হলেও সেটি গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি নেয়া হয়েছে। গত বছর এই সময়ে ঋণ নেয়া হয়েছিল মাত্র ৫ হাজার ১ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত থেকে সবচেয়ে কম ঋণ নিয়েছে সরকার।

যদিও প্রতিবছর ঋণ নেয়ার সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ঋণ নিয়েছে সরকার ৮ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। অবশ্য ইতোমধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজে ঋণ বাস্তবায়ন করছে।

যে কারণে ব্যাংক থেকে ঋণ কম নিচ্ছে। কারণ এখান থেকে ঋণ বেশি নেয়া হলে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে সমস্যা হবে। পাশাপাশি বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারবে না আর্থিক সংকটের কারণে। আর বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঋণ না পেলে বিনিয়োগ করতে পারবে না। এতে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

সরকারের ধারদেনার বড় অংশ জুড়ে আছে অভ্যন্তরীণ উৎস। এই উৎসে রয়েছে ব্যাংকিং ও সঞ্চয়পত্র খাত। পর্যালোচনা করে দেখা গেছে এই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে লক্ষ্যমাত্রার নির্ধারণ ছিল তার চেয়ে কম ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রথম প্রান্তিকে অভ্যন্তরীণ ঋণ নেয়ার কথা ছিল ২৭ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে ঋণ নেয়া হয়েছে ২২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা।

খবরটি শেয়ার করুন
x